ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরার বিলুপ্তপ্রায় শিল্প
- 11 minutes ago
- 4 min read
বাংলাদেশের রূপসী চিত্রা নদীর বুকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরার প্রায় হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যটি অন্বেষণ করছেন ড.অর্টন…

ছোটবেলা থেকেই মাছ ধরার পেশায় যুক্ত শ্যাম বিশ্বাস। রাতের বেলায় চারজন পুরুষ এবং তাদের দলের- আরও দুই বিশেষ সদস্যকে নিয়ে তিনি মাছ ধরতে বের হন।
এগুলো মূলত ভারতীয় মসৃণ-লোমযুক্ত ভোঁদড়, যেগুলোকে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের সুন্দর চিত্রা নদীতে পুরুষদের মাছ ধরায় সাহায্য করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শ্যাম জানান করেন যে তার এই চার-পেয়ে সহকর্মীরা বেশ দুষ্টু। শ্যামের স্ত্রী লতিকা আমাকে বললেন, ভোঁদড়গুলো নিজেদের মধ্যে প্রচুর মারামারি করে এবং দৃশ্যটি সত্যিই খুব মজার।
বাংলাদেশের নড়াইল ও খুলনা জেলায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরা এক প্রাচীন ঐতিহ্য, যা আজ বিলুপ্তির পথে। শ্যাম বিশ্বাসের বয়স চল্লিশের কোঠার শেষভাগে, তিনি থাকেন নড়াইলের গোবরা গ্রামে। ভোঁদড় এর সাহায্যে মাছ ধরাটাই তার একমাত্র কাজ।
ভোঁদড়ের গল্প
এক তারাভরা মেঘমুক্ত সন্ধ্যায়, ভোঁদড় দিয়ে মাছ কীভাবে ধরা হয় সেটা দেখতে আমি নদীতে শ্যাম ও তার দলের সাথে দেখা করি। বনের কীটপতঙ্গের গুঞ্জন, মাঝে মাঝে ডাক দেওয়া নৈশপাখি আর জেলেদের জলে ছাড়ার প্রস্তুতির সময় ভোঁদড়ের ডেকে ওঠার শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোনো শব্দ ছিল না।
ভোঁদড়গুলো কিন্তু মূলত মাছ শিকার করে না; বরং মাছ তাড়িয়ে জালের দিকে নিয়ে আসাই এদের মূল কাজ। জলের বুকে এদের চপল রূপ দেখার মতো, নদীর তীর ঘেঁষে কী দারুণ মসৃণ ভঙ্গিতে ভেসে চলে এরা! এর মধ্যেই একটি ভোঁদড় আবার একটা ব্যাঙ ধরে ফেলল, আর সন্ধ্যার অনেকটা সময়জুড়ে পরম আনন্দে সেটা চিবিয়ে কাটাল!
শ্যাম তাঁর এই নিজস্ব কৌশলের বর্ণনা দিয়ে বলেন: “আমরা প্রথমে ভোঁদড়গুলোকে জলের নামিয়ে দিই। এরপর ওরা নদীর আনাচে-কানাচে আর ঝোপেঝাড়ে লুকিয়ে থাকা মাছগুলোকে তাড়া করে। মাছগুলো ওদের গায়ের শব্দ পেয়েই ছুটে এসে সোজা জালে ঢুকে পড়ে… ভোঁদড়গুলো যখন জলে ডুব দেয়, ওদের আওয়াজেই বিভ্রান্ত হয়ে মাছগুলো জালের ফাঁদে পা দেয়। এরপর আমরা সব মাছ ধরে ধরে নৌকায় তুলে রাখি।”

ভোঁদড়গুলোর গায়ে জড়ানো থাকে দড়ির সাধারণ বাঁধন, যা জেলের পায়ে থাকা একটি লাঠির সাথে বাঁধা থাকে। আর মাছ তোলার জন্য জেলেরা চারকোনা বা আয়তাকার ছাঁকি জাল বা মাছ তুলতে পারার মতো এক বিশেষ জাল ব্যবহার করেন। শ্যাম আমাকে জানান, একটি নৌকার জন্য অন্তত চারজন লোক লাগে: “দুজনকে জাল ফেলে মাছ ধরতে হয়, আর অন্য দুজনকে দিতে হয় নৌকার হাল। অর্থাৎ, দুজন মাছ ধরেন আর অন্য দুজন নৌকাকে সোজা রাখেন।”
পরদিন সকালে শ্যামের নৌকায় গিয়ে দেখা মিলল ভোঁদড়ের ছোট্ট ছানাগুলোর-বাঁশের তৈরি একটা বাক্সে শান্ত হয়ে বসে আছে ওরা। জেলেরা এই ছানাগুলোকে বন্দিদশাতেই নিজেদের কাছেই লালন-পালন করে বড় তোলেন। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ শিকারি করে তুলতে সময় লাগে মাস তিনেক। সাধারণত দলের বড় ভোঁদড়ের খাবার দেওয়ার আগেই এই ছানাগুলোকে খেতে দেওয়া হয়। খাবার দেওয়ার জন্য শ্যাম বাক্সের ঢাকনা খোলার আগেই, ছানাগুলো বাঁশের চেঁড়ির ফাঁক দিয়ে নাক বাড়িয়ে দিয়ে বেশ চেঁচিয়ে মিউ মিউ করে ডাকতে থাকে।

আমি জানি সুযোগ পেলেই ওরা আমাকে কামড়ে দেবে, কিন্তু তাও ওদের দেখে মন জুড়িয়ে যায়, ওরা কী যে মিষ্টি! শ্যাম জানান যে ভোঁদড়ের ছানাগুলোকে গরুর দুধ খাওয়ানো হয়। ওদের বয়স সবে তিন মাসের মতো, কিন্তু আর এক মাস পর বড় ভোঁদড়গুলোও এদের সাথে প্রতিযোগিতায় পারবে না। বড় হলে এই ছানাগুলোকে অন্য ভোঁদড়-জেলেদের কাছে বিক্রি করা হবে।
বিলীয়মান এক ঐতিহ্য
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশের সমতলে এঁকেবেঁকে বয়ে চলা চিত্রা নদী আজ প্রায় পুরোপুরি সবুজ কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। এই কচুরিপানা মূল নদীটিকে এক সজীব সবুজ রূপ দিলেও, এটি মূলত একটি ক্ষতিকর আক্রমণকারী আগাছা।

এই এলাকাটি আরও বেশ কিছু পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার মধ্যে অন্যতম হলো নদীটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়া। চিত্রা মূলত একটি স্বাদুজলের নদী, কিন্তু বিগত ৪০ বছর ধরে উজানের বাঁধ গঙ্গা থেকে জল সরিয়ে নিচ্ছে। উত্তর দিক থেকে আসা এই স্বাদুজলের প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় নদীর লবণাক্ততা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
শ্যাম আমাকে জানায় যে নদীতে এখন আগের চেয়ে মাছ কমে গেছে: “প্রথম কারণ হলো নদীতে লোনা জল ঢুকে পড়া। লোনা জলের কারণে নদীর জল শুকিয়ে যাচ্ছে। আর নদীর জল যত শুকাচ্ছে, মাছও তত কমে যাচ্ছে। এর মানে হলো নদীর তলদেশে পলির স্তর জমছে… মাছের ঘুরে বেড়ানোর জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকছে না।”
গান্ধী বিশ্বাস এতে সহমত প্রকাশ করেন। তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরছেন, তবে তিনি জানান যে পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও খারাপ হয়েছে। আগে এই নদীতে প্রচুর মাছ ছিল।
এর ফলে, ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরার শিল্পটি হারিয়ে যেতে বসেছে। শ্যাম লক্ষ্য করেছেন যে ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকারের প্রচলন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। গোবরা গ্রামে আগে প্রায় ৩০টির মতো নৌকা দেখা যেত, অথচ এখন সেখানে রয়েছে মাত্র পাঁচটি।
“ আগে সবাই ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরত। আর এখন সবাই এই কাজ ছেড়ে অন্য কাজ করছে।”
ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরার ভবিষ্যৎ
ভবিষ্যতের কথা ভেবে শ্যামের স্পষ্ট কথা, সন্তানদের আর এই পেশায় নামতে দেবেন না তিনি। “এই কাজে যা আয় হয়, তাতে পেটই ভরে না,” আক্ষেপের সুর শ্যামের গলায়, “তাহলে ওরা খাবে কী? আমরা নিজেরাই ঠিকমতো খেতে পারি না, ওদের ঠিকমতো যত্নও নিতে পারি না। ওরা অন্য কিছু করে নিজেদের জীবন চালাবে।”
এই হাজার বছরের ঐতিহ্য একদিন হারিয়ে যাবে ভেবে বুকটা ভারী হয়ে ওঠে শ্যামের। বিষণ্ন কণ্ঠে তিনি বলেন, “তখন মনটা তো খারাপ হবেই। কিন্তু কী আর করা! এই কাজ ধরে রাখার মতো মানুষই যদি না থাকে, তবে আর করার কীবা থাকে?”

তবে আপাতত, ভোঁদড়গুলো তাদের এই সংসারেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একগাল হেসে বাচ্চারা বলল, “আমরা ওদের বড্ড ভালোবাসি! কোলে নিয়ে খেলি, খাইয়ে দিই, আদর করি, জড়িয়ে ধরে চুমু খাই... কত কী যে করি ওদের নিয়ে!”
ভোঁদড়দের সাথে প্রথম দেখার স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে লতিকা বলেন, “এখানে এসে প্রথম আমি ভোঁদড় দেখেছি, আমাদের এলাকায় আগে কখনো দেখিনি… প্রথমে খুব ভয় লাগত। কিন্তু এখন ওদের দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন আর ভয় করে না… এখন তো ওরা আমার কাছে ঘরের পোষা প্রাণীর মতো! আর একদম ভয় পাই না।”
যোগাযোগ করুন
হিমালয় ও সুন্দরবনে ড. অর্টনের সরেজমিন গবেষণার চমৎকার সব ছবি দেখতে আমাদের অর্টন একাডেমি ইনস্টাগ্রাম পেজটি ফলো করুন। আপনার সাথে যুক্ত হতে পারলে আমাদের ভীষণ ভালো লাগবে!



