আসুন একটু ম্যানগ্রোভ নিয়ে কথা বলি
- Jul 26
- 5 min read
২৬শে জুলাই 'আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ দিবস'। দিবসটি উদযাপনে, ড. অর্টন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনে তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন কেন আমাদের এই মনোমুগ্ধকর জায়গাগুলো নিয়ে আরও বেশি আলোচনা করা উচিত…

একরাশ তারায় ভরা আকাশের নিচে, জোনাকির আলোছায়া আর খড়স্রোতে ভেসে চলা একটি একাকী গোলপাতা নৌকার সান্নিধ্যে সুন্দরবনে এসে যখন পৌঁছালাম,ম্যানগ্রোভ সম্পর্কে আমার জানাশোনা তখন ছিল একদমই সামান্য। আমার শুধু ঝাপসা একটা ধারণা ছিল যে, এরা এমন এক অদ্ভুত জাতের গাছ যা নোনা পানি সহ্য করতে পারে এবং প্রতিনিয়ত জোয়ার-ভাটার ওঠানামার সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে জানে। শুনেছিলাম সুন্দরবন নাকি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, আর এটিই পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন যেখানে বাঘের অবাধ বিচরণ। তবে তখনও আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে মানুষের জীবনে এই ম্যানগ্রোভ বন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, - এবং টিকে থাকার জন্য আমাদের ভালোবাসার কতটা প্রয়োজন এই ম্যানগ্রোভ এর জন্য।
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে ভারত ও বাংলাদেশের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সুন্দরবন এক রহস্যময় ঘন জঙ্গল যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে: যদিও বনটির এক-তৃতীয়াংশ স্থায়ীভাবে জলের নিচে তলিয়ে থাকে, আর পুরো বনটিই জোয়ার-ভাটার করুনার উপর নির্ভর করে। পরিবর্তনশীল এই বিরূপ প্রকৃতির মাঝেই মানিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকা এখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের জন্য এক অনন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
ম্যানগ্রোভনামা
ম্যানগ্রোভের শিকড় ছড়িয়ে আছে সুদূর প্রাচীন ইতিহাসে; ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষভাগে এদের প্রথম আবির্ভাব ঘটেছিল। ব্রাজিলে খুঁজে পাওয়া প্রবীণতম ম্যানগ্রোভ জীবাশ্মটির বয়স প্রায় ৭ কোটি বছর! অবশ্য তারও আগে, ডেভোনিয়ান যুগে, ঠেস-মূলের মতো শিকড়যুক্ত গাছ আর ফার্নে ভরা এক সবুজ জলাভূমি-অরণ্য মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। সুন্দরবনের সংকীর্ণ খাঁড়িপথগুলো দিয়ে চলার সময় ম্যানগ্রোভের সেই ঝুলন্ত মূলগুলোর দৃশ্য দেখে মনে হয়, যেন আমি একটি প্রাকৃতিক ক্যাথেড্রালের মধ্যে দিয়ে ভেসে চলেছি।
আজকের দিনে সুন্দরবনের এই ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। এটি চিত্রা হরিণ, ভোঁদড়, বুনো শুয়োর, রীস্যাস বানর এবং অবশ্যই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের এক বিশ্বস্ত আশ্রয়স্থল। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এক গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে স্থানীয় মানুষের সাথে বাঘের সম্পর্কের সমীকরণ খুঁজতেই আমার সুন্দরবনে আসা; তবে এখানে এসে বুঝতে পারলাম, মানুষ ও বাঘের লড়াই ছাড়িয়ে এই বনটি নিজেও আমাদের মনোযোগ আর ভালোবাসার দাবিদার।
শুধু ডাঙ্গার এই প্রাণীরাই যে বনটিকে বিশেষত্ব দিয়েছে তা নয়; ম্যানগ্রোভ বন পরিযায়ী মাছ ও পাখির জন্যও এক অমূল্য বিচরণক্ষেত্র। এখানকার নদীর মোহনাগুলোতে দেখা মেলে কুমির, গঙ্গা নদীর শুশুক, ইরাবতী ডলফিন এবং 'মুডস্কিপার' নামের এক অদ্ভুত ছোট্ট মাছের যেটা মুখে জল ধরে রেখে বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে দিব্যি ডাঙায় বেঁচে থাকতে পারে।
প্রজননের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল এক পরিবেশে, যেখানে পরাগায়ন ঘটানো পতঙ্গের সংখ্যা খুবই কম, ম্যানগ্রোভ গাছগুলো বার্ষিক জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের ফুল ফোটার সময় নির্ধারণ করে নেয়। পাশাপাশি, নোনা পানির সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য এরা 'জরায়ুজ অঙ্কুরোদ্গম' এর কৌশল ব্যবহার করে। এছাড়া, এদের পুরু মোমের আস্তরণযুক্ত পাতা ও ক্ষুদ্র লোমশ অংশ ক্ষতিকারক অণুজীব, পতঙ্গ এবং তৃণভোজী প্রাণীদের আক্রমণ থেকে গাছকে রক্ষা করে।

একই সাথে, ম্যানগ্রোভ বন কিন্তু এই সমস্ত জীবকুলকে বাঁচিয়েও রাখে। এরা অত্যন্ত উৎপাদনশীল এবং অন্যান্য জীবনের সাথে এক অবিচ্ছেদ্য শক্তির সংযোগ গড়ে তোলে। ম্যানগ্রোভের শিকড়, পাতা, ছাল ও কাঠ থেকে যে জৈব পদার্থ তৈরি হয়, তা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং তৃণভোজী প্রাণীদের প্রধান খাদ্যে পরিণত হয়। আর এই তৃণভোজীরা আবার বাঘের মতো অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যের জোগান দেয়।
ম্যানগ্রোভ না থাকলে, এই রূপকথার মতো পুরো জগতটাই হারিয়ে যাবে চিরতরে।
মানুষের প্রয়োজনে ম্যানগ্রোভ
সুন্দরবন হারিয়ে গেলে যে কেবল বন্যপ্রাণীরাই বিলুপ্ত হবে, তা নয়। এই বন যদি না থাকত, তবে ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডবে প্রাণ হারাত লাখ লাখ মানুষ। বঙ্গোপসাগরের হিংস্র রূপ থেকে ভারত ও বাংলাদেশকে আগলে রাখা এক প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যালওয়্যার্ক বা রক্ষা-কচ এই বন। ঝড়-ঝাপটা প্রতিহত করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে ম্যানগ্রোভের, যা কোটি টাকা খরচে তৈরি কৃত্রিম বাঁধের চেয়েও শক্তিশালী প্রাচীর হয়ে আমাদের সুরক্ষা দেয়।
সমস্যা সমাধানে ম্যানগ্রোভ গাছ যেন এক দূরদর্শী স্থপতি: দিনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়গুলোতে নিজেদের পাতার রন্ধ্র বন্ধ রেখে এরা অতিরিক্ত পানি বাষ্পীভবন রোধ করে। আর সুন্দরবনের কাদাটে ও অস্থিতিশীল মাটিতে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ কাটাতে এরা তৈরি করেছে মজবুত ঠেস-মূল, যা একই সাথে গাছের শ্বসন অঙ্গ হিসেবেও কাজ করে।
এসব গুণাবলীই ম্যানগ্রোভকে অনেক পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রকৃতির এক অনন্য 'প্রাকৃতিক সমাধান' হিসেবে গড়ে তুলেছে: এরা বিপুল পরিমাণ কার্বন সঞ্চয় করে রাখে এবং মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির স্থায়িত্ব বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অবশ্যই বনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিচালনা করা প্রয়োজন; তবে স্থানীয় মানুষের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে দায়িত্বশীলভাবে করা হলে ম্যানগ্রোভ বন মাছ ধরা, গোলপাতা সংগ্রহ, কাঠ এবং মধু সংগ্রহের দারুণ সুযোগ তৈরি করে দেয়। আর দুর্ধর্ষ 'মৌয়ালি'দের হাত দিয়ে সংগৃহীত সুন্দরবনের সেই খাঁটি মধু অত্যন্ত সুস্বাদু!
সুন্দরবনের লুকায়িত উপহার
সর্বোপরি, ম্যানগ্রোভ বন মানুষের জন্য এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ: সুন্দরবন যেমন ভারত ও বাংলাদেশের অনন্য সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত ঐতিহ্যের ধারক, তেমনি এটি আমাদের সমগ্র বিশ্বের এক অমূল্য অংশীদারিত্বমূলক বিশ্বঐতিহ্য।
এই বন যে কেবল ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেরই জাতীয় পশু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আবাস্থল তা-ই নয়, বরং এই অঞ্চলের খ্যাতিমান শিল্পী ও সাহিত্যিকদের জন্য এটি এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস। প্রখ্যাত ভারতীয় লেখক অমিতাভ ঘোষ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য হাংরি টাইড’ এবং বনবিবির উপাখ্যান নিয়ে লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘জঙ্গল নামা’-র মাধ্যমে সুন্দরবনকে যেন সাহিত্যের আঙিনায় এক অমর রূপ দিয়েছেন।
তবে আমার কাছে সুন্দরবনের দেওয়া সবচেয়ে দামি সাংস্কৃতিক উপহার হলো এর সীমানাবেষ্টনীতে বসবাসকারী ‘সাধারণ মানুষের’ মুখের প্রচলিত রূপকথা, লোকগাঁথা আর লোকসংগীত। এখানে মুসলিম, হিন্দু এবং আদিবাসী মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করে। বনদেবী বনবিবির উপাখ্যান আজও এখানে জীবন্ত, একইভাবে বেঁচে আছে তাঁর ভাই শাহ জঙ্গলী, বাঘ-দানব দক্ষিণ রায় এবং এক ছোট ছেলে দুখের গল্পগুলো। আর বনের গভীরে যারা পা বাড়ায়, তাদের সুরক্ষার জন্য 'গুণিন' এবং অন্যান্য ধর্মীয় সাধকেরা তো নানা রক্ষাকবচের আনুষ্ঠানিকতা বা মন্ত্রতন্ত্র পালন করেন।

সুন্দরবনে আমি যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, তারা নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় এবং নানাবিধ পরিবেশগত হুমকির মুখে নিজেদের ও এই বনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ে এক নিমেষেই ভেসে যেতে পারে আবাদি জমি আর ঘরবাড়ি। আস্ত গ্রাম তছনছ হয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যার ফলে উপায়ান্তর না দেখে কৃষক পরিবারগুলোকে জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে মাছ ধরার পেশায় জড়িয়ে পড়তে হয়। এমনকি কেউ কেউ তো আমাকে বুকফাটা কষ্টে বলেই ফেলেছেন সুন্দরবন ছেড়ে চিরতরে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ তাদের খোলা নেই।
উজানের বাঁধ ও ব্যারেজের কারণে বন উজাড়, জলস্তর বৃদ্ধি এবং মিঠা পানির ঘাটতিতে সুন্দরবন নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ও বনের জন্য এক বড় হুমকি হতে পারে, যেমন ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর, যা এই সুন্দরবনের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
সুন্দরবনের আজ আমাদের প্রয়োজন
আমাদের এখন ম্যানগ্রোভ বন নিয়ে আরও বেশি বেশি আলোচনা করা দরকার। এর ইকোসিস্টেমের ভূমিকা ও খাদ্য শৃঙ্খল নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ১৯৭০-এর দশকে শুরু হয়েছে;এবং ঐতিহাসিকভাবেই ম্যানগ্রোভ সুরক্ষায় জনমত দুর্বল ছিল।। রেইনফরেস্টের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেমের তুলনায় ম্যানগ্রোভের গুরুত্ব ও অপরিসীম মূল্য সম্পর্কে আজও খুব কম মানুষই সচেতন।
বর্তমানে চিত্রটি বদলাচ্ছে, 'ব্লু কার্বন' অর্থাৎ ম্যানগ্রোভ, জোয়ার-ভাটার জলাভূমি এবং সামুদ্রিক ঘাসের মতো উপকূলীয় ও সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমে সঞ্চিত কার্বন নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ দিনে দিনে বাড়ছে। অবশেষে ম্যানগ্রোভ বনগুলো সেই প্রাপ্য গুরুত্ব ও মনোযোগ পেতে শুরু করেছে, যা তাদের বহু আগেই পাওয়া উচিত ছিল।
আলোচনা তো সবেমাত্র শুরু হচ্ছে। যুক্ত হোন আমাদের সাথে!
যোগাযোগ করুন
হিমালয় ও সুন্দরবনে ড. অর্টনের সরেজমিন গবেষণার চমৎকার সব ছবি দেখতে আমাদের অর্টন একাডেমি ইনস্টাগ্রাম পেজটি ফলো করুন। আপনার সাথে যুক্ত হতে পারলে আমাদের ভীষণ ভালো লাগবে!



